বর্ষায় জমে উঠেছে নেছারাবাদের ভাসমান ডিঙি নৌকার হাট
সারি সারি ডিঙি নৌকা। খাল বেয়ে নৌকা নিয়ে হাটে আসছেন বিক্রেতারা। বড় নৌকা কিংবা ট্রলারে করেও আনা হচ্ছে আবহমান বাংলার অতি পরিচিত এই জলযান। খালের পানিতে ঢেউয়ের তালে তালে চলছে নৌকা কেনাবেচা। পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর খাল এলাকায় বর্ষা মৌসুমে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। প্রতি শুক্রবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে ডিঙি নৌকার হাট। স্থানীয়দের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকেও ক্রেতারা আসেন নৌকা কিনতে।
নৌকা ব্যবসায়ীরা জানান, নদী, খালবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের অন্যতম বাহন এখনো নৌকা। প্রতি হাটে আটঘর খালে ডিঙি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আকারের শত শত নৌকা ওঠে। তবে কাঠ ও কারিগরের মজুরিসহ নৌকা তৈরির খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় বেচাকেনা কমেছে। কোনো রকমে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
শুক্রবার উপজেলার বলদিয়া এলাকা থেকে হাটে ৩৫টি নৌকা নিয়ে আসেন কামরুল ইসলাম। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই হাটে নৌকা বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, বর্ষার সময়ে হাটে ক্রেতা বেশি থাকে। কিন্তু এবার বিক্রি কম। ৩৫টি নৌকা নিয়ে এসে মাত্র একটি বিক্রি করেছেন। ৯ হাত লম্বা একটি নৌকা ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়।
ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, ভালো মানের ৯ হাত একটি নৌকা তৈরি করতে একজন কারিগরের প্রায় দুই দিন সময় লাগে। দৈনিক ৮০০ টাকা মজুরি হিসেবে শ্রমিক খরচ পড়ে ১৬০০ টাকা। কাঠের খরচ প্রায় ২ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে খরচের তুলনায় নৌকা বিক্রি করে লাভ খুবই কম। তার ভাষ্য, বর্তমানে নৌকার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।
হাটে নৌকা কিনতে আসা বিনয়কাঠি গ্রামের আজিজ হাওলাদার বলেন, মাছ ধরার জন্য ডিঙি নৌকা কিনতে এসেছেন। গত বছরের তুলনায় এবার নৌকার দাম কিছুটা কম মনে হচ্ছে। ইজারাদার ইকবাল জানান, নৌকাপ্রতি ১০০ টাকায় ১২ টাকা হারে খাজনা নেওয়া হচ্ছে। তবে অনেকের কাছ থেকে এর চেয়েও কম নেওয়া হয়। এ বছর বেচাকেনা কম। তার হিসাবে, এক হাটে ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা বিক্রি হয়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতি হাটে অন্তত ২০০টি নৌকা বিক্রি হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীদের মতে, প্রায় দেড়শ বছর আগে হাটের গোড়াপত্তন হওয়া আটঘর হাটে বর্ষা এলেই মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। নৌকার সারি, খালের ঢেউ আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে প্রতি শুক্রবার ফিরে আসে পুরোনো সেই চিত্র। নৌকার ব্যবহার আগের তুলনায় কমে এলেও প্রয়োজন ও ঐতিহ্যের টানে এখনো টিকে আছে আটঘরের এই হাট। শুধু বেচাকেনার জায়গা নয়, আটঘরের ডিঙি নৌকার হাট দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, জীবিকা ও নৌসংস্কৃতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য।
জাগো সংবাদ/আরাফাত

