নদীভাঙনে গাইবান্ধায় ৮ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিলীন, অনিশ্চিত দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ
তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অব্যাহত ভাঙনে গাইবান্ধার চরাঞ্চলে এ বছর অন্তত আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ছয়টি বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। বিদ্যালয় ভবন হারিয়ে কোথাও খোলা আকাশের নিচে, আবার কোথাও টিনের ছাপড়া তুলে চলছে পাঠদান। এতে দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর পড়ালেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে মাত্র দুই দিনে অন্তত আড়াই শতাধিক ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। উপজেলার কাপাসিয়া, ভোরের পাখি ও লালচামার এলাকার অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসেছে। খাবারের সংকট দেখা দেওয়ায় এসব পরিবারের অনেকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুহারা মানুষের জন্য সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে প্রতিদিন খিচুড়ি রান্না করে বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিএনপির পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চরাঞ্চলের বালুচরে একসময় যেখানে ছিল বিদ্যালয় ভবন, শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ-টেবিল আর শিক্ষার্থীদের কোলাহল—নদীভাঙনে এখন সেখানে শুধু পানি আর পানি। তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নদীতীরবর্তী এলাকার অন্তত ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ইতোমধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার আঙ্গারীদহ, উত্তর খাটিয়ামারি ও চর চৌমোহন, সদর উপজেলার সীতাসতী এবং সুন্দরগঞ্জের ভোরের পাখিসহ আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভবন হারানো আটটি বিদ্যালয়ের কোথাও খোলা আকাশের নিচে, আবার কোথাও অস্থায়ী ছাপড়ার নিচে চলছে পাঠদান। এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী নিয়ে দুই শ্রেণির পাঠদান চলছে।
ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান বলেন, ‘আমাদের স্কুল, আশপাশের গ্রাম—সব নদীতে চলে গেছে। আমাদের স্কুলের শিশুরা কে কোথায় চলে গেছে, বলতে পারি না। তবে এখনও চার টিনের ছাপড়ার নিচে দুই ক্লাসের চারজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ক্লাস চলছে।’
শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানান, খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি এবং প্রতিকূল পরিবেশে পাঠদান করায় অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে না। ফলে এসব শিশুর দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এদিকে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে চাল বিতরণ করেছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল থেকে নদীতে জিও ব্যাগ ফেলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন তীব্র হওয়ার পর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় এখন তা খুব বেশি কাজে আসছে না।
সাবেক ইউপি সদস্য রাজা মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘নদীতে সব চলে গেল, আর এখন বস্তা ফেলে রক্ষার কাজ শুরু করলেন।’
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ত্রাণ ও সাময়িক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলোর জন্য দ্রুত নতুন জায়গা নির্ধারণ করে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থীদের তালিকা করে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে চরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শিশুর শিক্ষাজীবন স্থায়ীভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জাগো সংবাদ/আরাফাত/কে

