রাকিব-ফরিদের বিরুদ্ধে দুদক-এনবিআরে লিখিত অভিযোগ
ঢাকা কাস্টম হাউসে ৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
রাজধানীর ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মো. আব্দুর রাকিব ও রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) ফরিদুজ্জামান।
গত ১১ জুন ২০২৬ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ১২ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর এসব অভিযোগে লিখিত আবেদন করেন এইচ. এম. ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিপুল পরিমাণ পণ্য খালাসের একটি কথিত চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড, ইউরেনাস অ্যাপারেলস (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড।
অভিযোগকারী দাবি করেন, তার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী কথিত এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তিনি অনুসন্ধান শুরু করেন। পরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য খালাসের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর এআরও আব্দুর রাকিব ও রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামান ওই কর্মচারীকে ডেকে পাঠান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য তার কাছে ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন হুমায়ুন কবির।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এআরও আব্দুর রাকিব কাস্টমস কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা পিছিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামান প্রিভেন্টিভ শাখার ডেপুটি কমিশনার আমিনুলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনিও প্রভাবশালী বলয়ের সুবিধা পাচ্ছেন বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এসব দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীর দাবি, বন্ধ বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কথিত রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় কুরিয়ার ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা থাকলেও দায় একতরফাভাবে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অভিযোগপত্রে সংযুক্ত নথি ও বিল অব এন্ট্রির বরাতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে লেস, ওভেন ফেব্রিক, নিট ফেব্রিক, বাটন, জিপার ও রাবার প্যাচসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ইউরেনাস অ্যাপারেলসের নামেই ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ এবং এর আগের বিভিন্ন সময়ে একাধিক বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ফেব্রিক স্যাম্পল ও ওভেন ফেব্রিক খালাসের তথ্য পাওয়া গেছে। একইভাবে কুইক অ্যাপারেলস ও এলিয়েন অ্যাপারেলসের নাম ব্যবহার করেও পণ্য খালাসের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগপত্রে থাকা নথির তথ্যানুযায়ী, কয়েকটি আমদানির মোট অ্যাসেসড ভ্যালু বা মূল্যায়ন প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৭ টাকা। এর বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৪৮৬ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীর দাবি, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৩৩ কোটি টাকার বেশি।
অভিযোগের অনুলিপি ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা শাখা সিআইআইসির মহাপরিচালকের কাছেও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারী জানিয়েছেন।
তার দাবি, বিল অব এন্ট্রি, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, বন্ড সুবিধা, পণ্য খালাসের নথি এবং রাজস্ব হিসাব যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এদিকে ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিব। তিনি বলেন, “এটা একটা ভুয়া অভিযোগ। আপনি আমার অফিসে আসেন। কফির দাওয়াত রইলো।”
অন্য অভিযুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামানের সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি লিখিত চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি অভিযোগকারী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবিরকে চেনেন না বলে দাবি করেন।
তবে ফরিদুজ্জামানের পাঠানো চিঠিতে থাকা অভিযোগকারীর স্বাক্ষর এবং দুদক ও এনবিআরে দেওয়া অভিযোগপত্রে থাকা স্বাক্ষরের মধ্যে অমিল রয়েছে বলে অভিযোগপত্রের নথি পর্যালোচনায় দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে ফরিদুজ্জামান প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি, বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রি, আমদানি নথি, বন্ড সুবিধা, রাজস্ব হিসাব এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগের পেছনে সত্যিই কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, নাকি এটি ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে করা কোনো অভিযোগ—তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হবে। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর দুদক ও এনবিআরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

