জনস্বাস্থ্য’র ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে প্রকৌশলী আনোয়ারকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল কর্মযজ্ঞকে ঘিরে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, স্বজনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারি কাজ নেওয়া এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ দাবিসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এস্টিমেটর মো. আনোয়ার হোসেন সিকদার। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প পরিচালকসহ দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে রদবদল হলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনোয়ারের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে অটুট রয়েছে। ফলে প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের প্রাক্কলন, দরপত্র ও কারিগরি প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, কাজের বিল পরিশোধের সময় আনোয়ারকে মোট বিলের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়। এ ছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায় থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অধিদপ্তরের কয়েকটি সূত্রের দাবি, কোনো কোনো প্যাকেজে প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়ার আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। এরপর সেই কাজের প্রাক্কলন তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ আগে কাজ নির্ধারণ, পরে এস্টিমেট তৈরির মতো একটি অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চালু ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ‘মেসার্স ওহি ট্রেডার্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি নথি ও ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে আনোয়ার হোসেন সিকদারের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের নাম রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ধরন হিসেবে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি ও সরবরাহকারী উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, যশোর ও চাঁদপুরে গ্রাউন্ড ওয়াটার বিভাগের কয়েকটি কাজ ওহি ট্রেডার্স পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এসব কাজ অর্থের বিনিময়ে অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগ যাচাইয়ে কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ বই, ব্যাংক লেনদেন এবং প্রকৃত বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হলেও আনোয়ার হোসেনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন একই ধরনের দায়িত্বে থাকার কারণে প্রকল্পের প্যাকেজ, প্রাক্কলন, দরপত্র ও কারিগরি প্রক্রিয়ায় তার বিশেষ প্রভাব তৈরি হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো প্রকল্প পরিচালকের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে আনোয়ার হোসেন সিকদারের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তার মূল পদ সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং তিনি দশম গ্রেডের সরকারি কর্মচারী। প্রতিবেদনে তার সরকারি বেতন ৩৫ হাজার টাকার কিছু বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে রাজধানীতে কোটি টাকা মূল্যের অ্যাপার্টমেন্টসহ বিপুল সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের পিসিকালচার হাউজিংয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা নিয়েও প্রতিবেদনে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার হোসেন প্রথমে সেখানে ভাড়ায় থাকার কথা জানান। পরে প্রশ্নের মুখে তিনি অ্যাপার্টমেন্টটি তার স্ত্রীর নামে রয়েছে বলে স্বীকার করেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যের হিসাব ধরে ওই অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য এক কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

