চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানার বাবু শ্যামল বড়ুয়ার বাড়ীতে দ্বিতীয়বার হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছ অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা। এতে বাবু শ্যামল বড়ুয়া, তার স্ত্রী ও মেয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
গতকাল সন্ধ্যায় আনুমানিক ১১:৩০ এর দিকে একদল সশস্ত্র লোক সামনের গেইট ভেঙ্গে জোরপূর্বক বাবু শ্যামল বড়ুয়ার বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ির আসবাবপত্র ভাঙচুর শুরু করে। ঘটনা চলাকালে বাড়ির ভিতরে শ্যামল বড়ুয়া ও তার স্ত্রী ও মেয়ে ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত নিচ্ছিলেন। এক পর্যায় শ্যামল বড়ুয়া দুর্বৃত্তদেরকে নিভৃত করতে আসলে, দুর্বৃত্তরা তাকে বেধড়ক মারপিট করতে থাকে এবং স্বামীকে বাঁচাতে আসলে শ্যামল বড়ুয়ার স্ত্রী, পপি বড়ুয়াকেও প্রচন্ডভাবে মার ধর করে তারা। এ সময় দুর্বৃত্তরা বাড়ির প্রতিটি রুমে শ্যামল বড়ুয়ার একমাত্র ছেলে পার্থ বড়ুয়াকে খুঁজতে থাকে। শ্যামল বড়ুয়ার মেয়ে পুঁজা বড়ুয়া এক রুমে পালিয়ে থাকলেও তাকে পেয়ে মারধর ও শ্লীতাহানি করতে চেষ্টা করে। শ্যামল বড়ুয়া, পপি বড়ুয়া ও পুঁজা বড়ুয়ার চিৎকারে এলাকার লোকজন জড় হতে থাকলে, দুর্বৃত্তরা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে দ্রুত প্রস্থান করে।পার্থকে দেখা মাত্র গুলি করে হত্যা করার হুমকিও দিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা।
মাঠ পর্যায়ে গিয়ে জানা যায়, বাবু শ্যামল বড়ুয়ার একজন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারি এবং এলাকায় তার বিভিন্ন অবদানের জন্য তিনি বাবু নামে পরিচিত। বাবু শ্যামল বড়ুয়া ও পপি বড়ুয়ার একমাত্র ছেলে, পার্থ বড়ুয়া বর্তমানে ইউকে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক হারে নির্যাতন ও নিপীড়ন হওয়ায় পার্থ বড়ুয়ার বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় এর প্রতিবাদ জানায়। বিশেষ করে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে পার্থ বড়ুয়া সর্বদা লেখালিখি করেন। গত ২৬ আক্টবর ২০২৪ তারিখে পার্থ বড়ুয়া মুসলিমদের দ্বারা সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলে, এলাকায় এ নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। তিনি দেশে থাকা অবস্থায় ইসলামের নামে দুর্বৃত্তপণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং বৌদ্ধের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়নে সক্রীয় ছিলেন।
স্থানীয়রা জানান , শ্যামল বড়ুয়া বৌদ্ধ হওয়ার কারণে এবং তার ছেলে পার্থ বড়ুয়ার সোস্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ করার জন্য তার পরিবার স্থানীয় প্রভাবশালী আনোয়ার মোল্যা ও তার লোকদের দ্বারা নিপীড়ণের শিকার হন। এদের নির্যাতনের ভয়ে পার্থ বড়ুয়া ২০২২ সালে ইউকেতে পাড়ি জমান এবং ওখানে বসবাস করছেন। তিনি প্রায়ই মুসলীম সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালিখি করেন এবং এরই জের ধরে গতকাল এই হামলা করা হয় বলে স্থানীয়রা ধারণা করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, শ্যামল বড়ুয়ার ছেলে পার্থ বড়ুয়া বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়াতে বৌদ্ধ নির্যাতন নিয়ে আনোয়ার মোল্ল্যা ও তার সমার্থক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লেখালিখি করতেন। সাথে সাথে তিনি বিএনপি ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সাথেও জড়িতছিলেন। পার্থর ফেসবুকের একটা পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে পার্থকে গত ২০২২ সালে একবার একদল দুর্বৃত্ত আক্রমণ করে এবং ধারালো অস্ত্রদিয়ে তাকে অঘাত করে রাস্তায় মৃতু ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। পথচারিরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করলে সেখানে চিকিৎসা দিতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে আবারো তাকে হত্যা করার জন্য দুর্বৃত্তরা জড়ো হতে থাকলে ডাক্তার তাকে দ্রুত ডিসচার্জ করে গোপন স্থানে সরিয়ে নিতে সাহায্য করেন। এর পর শ্যামল বড়ুয়া ছেলে ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে নিজ ছেলে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন।
শ্যামল বড়ুয়ার এক আত্মীয়, ইন্দ্রনীল চৌধুরী জানান, গত ৯ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আনুমানিক রাত ১০ টার সময় একদল দুর্বৃত্ত শ্যামল বড়ুয়ার বাড়িতে হামলা চালায় এবং বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। গতকাল আনোয়ার মোল্লার সমর্থকগোষ্টি আবারো শ্যামলের বাড়িতে হামলা চালায় এবং হামলার সময় শ্যামল বড়ুয়া, তার স্ত্রী ও মেয়ে হামলাকারীদের হাতে মারাত্মক ভাবে আহত হন। দুর্বৃত্তরা শ্যামল বড়ুয়ার স্ত্রী ও মেয়ের মূল্যবান গহনা সহ অনেক মূল্যবান জিনিস লুটকরে নিয়ে যায় এবং অবশেষে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও অনেক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। জানা গেছে শ্যামল বড়ুয়া, পপি বড়ুয়া ও পুঁজা বড়ুয়াকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এলাকার মুদি দোকানদার রমিজ বেপারীজানান, পার্থ বড়ুয়া ইউকে থেকে সোস্যাল মিডিয়ায় নানাবিদ পোস্ট করে থাকেন। এতে কিছু চরমপন্থী লোক ক্ষিপ্ত হয়ে পার্থকে খুঁজতে শ্যামল বড়ুয়ার বাড়িতে হানা দেয়া এবং বাড়িটি ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, পার্থ বাড়িতে না থাকায় এ যাত্রায় তিনি বেঁচে গেছেন। অন্যথায় পার্থকে অপ্রত্যাশিত ফলাফল ভোগ করতে হত।
স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলার গিয়াস উদ্দীন জানান, শ্যামল বড়ুয়ার পরিবার সংখালঘু হওয়ায় তারা অনেক বার বিভিন্ন ভাবে অত্যাচারের শিকার হোন। শ্যামল বড়ুয়ার ছেলে পার্থ বড়ুয়ার সংখালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লেখালিখি করায় অনেক প্রভাবশালী আলিম ওলামাদের সাথে বড় ধরনের শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ফলে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের পরবর্তীতে বাংলাদেশে সংখালঘু নির্যাতন বেড়ে যায় এবং ৯ আগস্ট শ্যামল বড়ুয়ার বাড়িতে হামলা চালায়। পার্থ বড়ুয়ার সোস্যাল মিডিয়ায় লেখালিখি করারা কারণে আবারো গতকাল তাদের বাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা হয়েছে।
আমাদের প্রতিনিধি স্থানীয় কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করলে কর্তব্যরত পুলিশ পরিদর্শক এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানান।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: Saturday, 26 October, 2024 । 4:08 pm