শিক্ষা প্রকৌশলের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ে অর্থ লেনদেন, নেপথ্যে কী?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: Monday, 17 August, 2026 । 11:17 am

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসান শওকতের অফিসকক্ষে অর্থ লেনদেনের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশের পর শিক্ষা প্রশাসনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়; এটি ২০২২ সালের ২৬ মে ধারণ করা।

তখন হাসান শওকত ছিলেন ঢাকা মেট্রো সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী। ভিডিওতে তাকে একটি অফিসকক্ষে বসে থাকতে দেখা যায়। তার সামনে থাকা দুই ব্যক্তির মধ্যে অর্থ লেনদেনের দৃশ্যও দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই দুই ব্যক্তি দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের দাবি, লেনদেনটি কোনো কর্মকর্তাকে ঘুষ দেওয়ার জন্য ছিল না; বরং একটি সরকারি নির্মাণকাজ হস্তান্তর এবং পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধের অংশ হিসেবে ওই টাকা দেওয়া হয়েছিল।

ঘটনার সূত্রপাত সরকারি বাঙলা কলেজের একটি ভবন নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে। দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার কাজটি পেয়েছিল ঢালী কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। নিয়ম অনুযায়ী, কাজটির চুক্তিমূল্যের ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৪ লাখ টাকা পারফরম্যান্স গ্যারান্টি হিসেবে জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

পরবর্তীতে ঢালী কনস্ট্রাকশন ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া ঘোষণা করায় কাজটি আটকে যায়। পরে কাজটি শেষ করার উদ্যোগ নেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেল। এ সময় তৃতীয় পক্ষ হিসেবে মিরন এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে বাকি কাজ শেষ করার বিষয়ে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, কাজ হস্তান্তরের সময় ঢালী কনস্ট্রাকশন তাদের জমা দেওয়া পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ ফেরত চায়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির প্রায় ২৪ লাখ টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা ঢালী কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধির হাতে দেওয়া হয়।

মিরন এন্টারপ্রাইজের মালিক রাকিব হোসেন মিরনের দাবি, ভবিষ্যতে টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোনো পক্ষ যেন অস্বীকার করতে না পারে, সে জন্য অর্থ হস্তান্তরের সময় ভিডিও ধারণ করা হয়। তার ভাষ্য, ভিডিওটি গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই ধারণ করা হয়েছিল।

ঢালী কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ফিরোজ আহমেদও টাকা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তাই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে টাকা গ্রহণ করা হয়।

তবে ভিডিওতে উপস্থিত কর্মকর্তা হাসান শওকত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, টাকা দিয়েছেন এক ঠিকাদারি পক্ষ এবং নিয়েছে অন্য ঠিকাদারি পক্ষ। তিনি সেখানে শুধু সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

হাসান শওকত বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়েছে এবং কাজ হস্তান্তর হয়েছে। পারফরম্যান্স গ্যারান্টির টাকা তারাই একে অপরকে দিয়েছে। তাকে ঘুষ নেওয়ার সঙ্গে জড়ানো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তার দাবি, তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক পয়সাও নেননি।

তবে এখানেই শেষ নয়। সরকারি অফিসকক্ষে ঠিকাদারি দুই পক্ষের মধ্যে এভাবে অর্থ হস্তান্তর এবং সরকারি নির্মাণকাজ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে শেষ করার প্রক্রিয়া বিধিসম্মত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে হাসান শওকতের বক্তব্য, বিভিন্ন প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কাজ শেষ করার ঘটনা ঘটে। এ ক্ষেত্রে আইন বা বিধির ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা তার জানা নেই।

অন্যদিকে, হাসান শওকতের দায়িত্বকাল নিয়ে শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের বিল নিয়েও অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ করা হয়, আটতলা ভবনের কাজ হলেও ১০তলা ভবনের বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনায় এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। নথি অনুযায়ী, ভবনটির ১০তলা পর্যন্ত ভিত্তি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু কেপিআইভুক্ত এলাকা এবং বঙ্গভবনের নিরাপত্তাজনিত কারণে পরে ভবনটি আটতলা পর্যন্ত নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।

প্রকল্পটির মূল দরপত্র মূল্য ছিল ২২ কোটি ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫০ টাকা। পরে সংশোধিত প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫০ টাকা। আটতলা ভবনের কাজ শেষে ঠিকাদার ১৭ কোটি ৮৪ লাখ ১২ হাজার টাকার ১৫তম চলতি ও চূড়ান্ত বিল জমা দেন।

নিরীক্ষার পর প্রথম থেকে ১৪তম বিল বাবদ ১৭ কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। চূড়ান্ত বিল থেকে ৮৫ হাজার টাকা স্থগিত রাখা হয়। নথি অনুযায়ী, নবম ও দশমতলার কাজের জন্য কোনো বিল পরিশোধ করা হয়নি।

এ ছাড়া হাসান শওকত নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধে সহযোগিতা করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সঙ্গে মিলছে না সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি নথি। ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেল থেকে অধীন কর্মকর্তাদের ঠিকাদারদের অগ্রিম বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান শওকতের স্বাক্ষর রয়েছে।

সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ২০২২ সালের ঘটনার বাস্তবতার পার্থক্য রয়েছে। ভিডিওতে অর্থ লেনদেনের দৃশ্য সত্য হলেও অর্থটি ঘুষ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল—এমন প্রমাণ এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। বরং সংশ্লিষ্ট দুই ঠিকাদারি পক্ষই এটিকে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ পরিশোধ হিসেবে দাবি করেছে। অন্যদিকে সরকারি কার্যালয়ে এ ধরনের অর্থ হস্তান্তর এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সরকারি কাজ শেষ করার প্রক্রিয়া বিধিসম্মত ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদী জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান তিনি।

এখন তদন্তেই পরিষ্কার হবে, ২০২২ সালের ওই ভিডিওতে দেখা অর্থ লেনদেন কেবল দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারফরম্যান্স গ্যারান্টির অর্থ হস্তান্তর ছিল, নাকি এর সঙ্গে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা প্রকল্পের অনিয়মের যোগসূত্র ছিল।

 

জাগো সংবাদ/আরাফাত

সম্পাদক: মোঃ মিজানুর রহমান নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আরাফাত আলী ফোন: ০১৮১৩-৫৩৮৩১৯, ০১৬২০-১৯০৮৮৫ ই-মেইল: jagosangbadmedia@gmail.com

প্রিন্ট করুন