বিনোদন ডেস্ক : চলচ্চিত্র প্রযোজকদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে মাল্টিপ্লেক্স। সিঙ্গল স্ক্রিন একটার পর একটা বন্ধ হলেও বাড়ছে মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা। এবারের ঈদে স্টার সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে লায়ন সিনেমাস পর্যন্ত- প্রত্যেকটা স্ক্রিনে ছিল দর্শকের ঢল। ঢাকা হোক আর ঢাকার বাইরে- মাল্টিপ্লেক্স মানেই ছিল দর্শকের বাঁধভাঙা উল্লাস। কিন্তু ব্যবসার এমন চাঙ্গা অবস্থা দেখে যতটা খুশি মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ, ততোটা হাসি নেই প্রযোজকদের মুখে। কারণ, টিকেট বিক্রি থেকে খুব বেশি হিস্যা পান না তারা, বেশিরভাগটাই চলে যায় মাল্টিপ্লেক্সের পকেটে।বাংলাদেশের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স স্টার সিনেপ্লেক্স। সারা দেশে এখন এর ৭টি শাখা। এই শাখাগুলোতে বিভিন্ন দামের টিকেট পাওয়া যায়। ৪০০ টাকা মূল্যের টিকেটে প্রযোজক পান ৮২ টাকা, ৩৫০ টাকা মূল্যের টিকেটে পান ৭২ টাকা, আর ৩০০ টাকা মূল্যের টিকেটে পান ৬২ টাকা।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় মাল্টিপ্লেক্স যমুনা ব্লকবাস্টার সিনেমাস। এখানে ৪০০ টাকার টিকেট থেকে প্রযোজক নেন ৭৯ টাকা। সর্বশেষ চালু হওয়া মাল্টিপ্লেক্স লায়ন সিনেমাসে ২৫০ টাকার টিকেট থেকে প্রযোজক নিতে পারেন ৬৩ টাকা।মূলত টিকেটের গায়ে লেখা প্রবেশমূল্য থেকেই নির্ধারিত হয় প্রদর্শক কত পাবেন আর প্রযোজক কত পাবেন। টিকেটের মূল্য যাই-ই হোক না কেন প্রবেশমূল্যের ৫০ শতাংশ পাবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আর ৫০ শতাংশ পাবে মাল্টিপ্লেক্স।
এটা ছবি মুক্তির প্রথম সপ্তাহের হিসাব। দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শেয়ার কমতে থাকে প্রযোজকের, কিন্তু বাড়তে থাকে হল মালিকের। প্রতি সপ্তাহে ৫% করে শেয়ার কমে প্রযোজকের আর ৫% করে বাড়ে হল মালিকের। প্রথম সপ্তাহে প্রদর্শক-প্রযোজক ভাগাভাগির অনুপাত ৫০%-৫০% শেয়ার হলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে অনুপাত: ৫৫%-৪৫%, তৃতীয় সপ্তাহে ৬০%-৪০%। তবে চতর্থ সপ্তাহ থেকে ৩৫%-এ স্থির হয়ে যায় প্রযোজেকর শেয়ার। অর্থাৎ ছবি যত বেশি দিন চলতে থাকবে প্রযোজকের আয় ততই কমতে থাকবে।
নির্মাতারা বলছেন, মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের কাছে উচ্চমূল্যে টিকেট বিক্রি করে। প্রযোজক সেখান থেকে পান গড়ে এক চতুর্থাংশ কিংবা তারও কম। তাই দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে ছবি দেখলেও লাভের মুখ দেখতে পারছেন না প্রযোজকরা।মাল্টিপ্লেক্স থেকে ন্যায্য হিস্যা চান প্রযোজকরা চলচ্চিত্র প্রযোজক মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, আপনি একটা টিকেট বিক্রি করছেন ৪০০ টাকা। আপনি আমাকে দিচ্ছেন ৬০ টাকা, বা ৭৫ টাকাই দিচ্ছেন। এটা হল বুঝে । কেউ ৫০ টাকা পায়, কেউ ৬০ টাকা পায়। কত টাকা পেলে একজন প্রযোজক তার চালানটা ওঠাতে পারবে? আমি যখন প্রযোজক সমিতির এজিএস ছিলাম, তখনও বলেছি, সিনেপ্লেক্সের মালিকদের সাথে বসা দরকার। এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত হোক। আপনাদের হল, আপনাদের সবকিছু, ঠিক আছে, আপনারা ৫০% রাখেন, ৫০% আমাদেরকে দেন। তাহলে একজন প্রযোজক হয়তো কিছু টাকার মুখে দেখতে পারে।
চলচ্চিত্র পরিচালক সৈকত নাসির বলেন, আমরা এখন সাধারণত ডিপেন্ড করি মাল্টিপ্লেক্সের ওপরে। মাল্টিপ্লেক্সলোতেও এখন একটা প্রতিযোগিতা চলে আসছে। আমাদেরকে লড়াই করতে হয় হলিউড, বলিউডের সঙ্গে। প্রযোজকরা আরেকটা ঝুঁকির জায়গায় পড়ে গেছে। আমি প্রযোজককে প্রথম্ই বলি, সিনেমা হল থেকে আট আনা পয়সাও আসবে না। বাকিটা আমাদের যে সাপোর্ট আছে ওটিটি, টিভি রাইটস, ওভারসিজ রাইটস, এসব দিক থেকে আমাদের বাজেটটা তুলে আনতে হয়।দিন-দিন ছবির নির্মাণব্যয় বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়ছে না প্রযোজকদের হিস্যা। অথচ মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ বাংলা ছবি থেকে মোটা অংকের ব্যবসা করে নিচ্ছে ঠিকই।
চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক মনতাজুর রহমান আকবর বলেন, পৃথিবীর সব দেশে ৫০%-৫০%। আপনি ৪৫০ টাকা পেলে ২২৫ আপনার, ২২৫ আমার। কলকাতা থেকে শুরু করে গোটা ভারতে এই নিয়ম। আপনি আমার সিনেমা চালাবেন, টাকা নিয়ে চলে যাবেন, আমি পথের ফকির হয়ে থাকব, সেটা তো হয় না। তারা সিনেপ্লেক্স করার সময় তো আমাদের সঙ্গে বসেনি। তারা তো বলেনি, আমরা সিনেপ্লেক্স করছি, আপনারা আমাদেরকে সিনেমা দেবেন, কিভাবে দেবেন বলেন।চলচ্চিত্র পরিচালক সাইফ চন্দন বলেন, আমি অনেক প্রযোজক ও প্রযোজক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা মাল্টিপ্লেক্স মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সম্পর্কিত ১৯ সংগঠনের মিটিং হয়েছে শুনলাম। সেখানে এটা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। শিগগিরই একটা সুষ্ঠু সমাধথানে আসবে।
এত বছর ধরে মাল্টিপ্লেক্সের বেঁধে দেয়া নিয়মেই ব্যবসা করেছেন নির্মাতারা। কিন্তু সিঙ্গল স্ক্রিন থেকে আয়ের সুযোগ কমে আসায় ছবির পুঁজি তুলে আনাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় মাল্টিপ্লেক্স থেকে আরো বেশি হিস্যা পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সংগঠন।২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবশেক সমিতি, পরিচালক সমিতি ও প্রদর্শক সমিতির নেতারা। সেই বৈঠকে তথ্যমন্ত্রী জানান, মাল্টিপ্লেক্সের টিকেটে প্রযোজকের অংশ ঠিক করে দেবে সরকার।
চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, একটা টিকেটের দাম ৫০ বা ১০০ টাকা। একজন প্রযোজক এখান থেকে পাচ্ছেন ৫০ বা ৬০ টাকা। তারা ৮ ভাগের ১ ভাগ টাকা দিচ্ছে। এটা আমাদের জন্য নগণ্য। তোমরা এই টাকা কেন আমাদেরকে দিচ্ছ? এটা প্রযোজকদের ন্যায্য অধিকার। আমরা ১৯ সংগঠন এ ব্যাপারে একটা বৈঠক করেছি। আমরা মাল্টিপ্লেক্সের সঙ্গে বসব।প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও মাল্টিপ্লেক্সের টিকেটে প্রযোজকের হিস্যা বাড়েনি, আসেনি সরকারের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা। এজন্য প্রযোজক পরিবেশক সমিতির অকার্যকর হওয়াকে দায়ী করেন চলচ্চিত্র নেতারা।
চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, মেরিট অনুযায়ী শেয়ারের ব্যাপারে আমরা অনেকদূর এগিয়েছিলাম। যেকোন ছবির একটা সম্মানজনক শেয়ার পাওয়া নিয়ে কথা বলেছিলাম। ৩০০ টাকা, ৩৫০ টাকার টিকেটে প্রযোজক পায় ৬০ টাকা, ৬৫ টাকা। এটা খুবই অযৌক্তিক।উল্টোদিকে মাল্টিপ্লেক্স মালিকরা বলছেন, প্রযোজকদের দাবি অযৌক্তিক। বাংলা ছবি চালিয়ে সারা বছর লোকসান গুণতে হয় তাদেরকে, চাইলেই টিকেটে শেয়ার বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়।
লায়ন সিনেমাসের কর্ণধার মির্জা আব্দুল খালেক বলেন, মাল্টিপ্লেক্সের একটা বড় অংক খরচ করতে হয় মেইনটিনেন্সের পেছনে। একজন দর্শক না থাকলেও হলের এয়ার কন্ডিশন ঠিক চলে। এতে একটা বড় অংকের বিদ্যুৎ খরচ চলে আসে। সিনেমার হলের ভেতরে অনেক সময় দেখা যায় কেবল মাত্র দুটো টিকেট বিক্রি হয়েছে। আমি কিন্তু বাধ্য শোটা চালানোর জন্য। সেই শোটা চালানোর জন্য এয়াকন্ডিশনসহ সমস্ত পরিবেশ আমাকে রাখতে হচ্ছে তেমন করেই যেমনটা হাউজফুল শোয়ের ক্ষেত্রে রাখতে হয়। প্রযোজক, পরিবেশকরা এই জিনিষগুলো বিবেচনা করতে চান না।আগামী দিনে ব্যবসা বাড়লে প্রযোজকদের দাবির প্রতি নমনীয় হবেন তারা, এমনটাও জানান মাল্টিপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: Wednesday, 9 August, 2023 । 6:12 pm