গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: Thursday, 4 June, 2026 । 3:00 pm

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান-এর বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিভিন্ন অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের শেষভাগে সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সারোয়ার জাহান বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত একাধিক অফিস আদেশে ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বদলি সম্পন্ন হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে একদিনেই অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলি আদেশ জারি করা হয়, যা সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে একই কর্মস্থলে দুই বছরের কম সময় দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বদলি করা হয়েছে, যা প্রচলিত বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, লোভনীয় পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন, নিয়মবহির্ভূত বদলি অনুমোদন এবং কিছু কর্মকর্তাকে হয়রানির মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক কয়েকটি বদলি আদেশ স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূত আদেশগুলো বাতিলের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন-এর নির্দেশে মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে বড় আকারের বদলি বা পদোন্নতির ফাইল অগ্রসর না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে জামানতের অর্থ অবৈধভাবে নগদায়নের অভিযোগ পূর্বেও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছিল। এ ঘটনায় ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে তাঁকে কোনো শাস্তি ছাড়াই বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর এলাকায় তাঁর বা তাঁর পরিবারের নামে একটি বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থ পাচার এবং বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সক্রিয় টেন্ডার সিন্ডিকেট ও কথিত ‘মাফিয়া চক্র’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে সারোয়ার জাহান দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এ প্রেক্ষাপটে দুদক ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকৌশলীর সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং সারোয়ার জাহানসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারী প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ইকবালুর রহিম বলেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলো সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জনস্বার্থ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সারোয়ার জাহান। তিনি বলেন, বদলির সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তি এককভাবে গ্রহণ করেন না। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন), নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন)সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সভার মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এদিকে, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা নিরূপণে দুদক ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি। তারা মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বদলি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিভিন্ন সময়ে বলে আসছেন, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু বদলি, অব্যাহতি বা চাকরিচ্যুতি যথেষ্ট নয়; আইনি বিচার ও কার্যকর শাস্তির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারদের প্রত্যাশা, চলমান তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

জাগো সংবাদ/আরাফাত

সম্পাদক: মোঃ মিজানুর রহমান নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আরাফাত আলী ফোন: ০১৮১৩-৫৩৮৩১৯, ০১৬২০-১৯০৮৮৫ ই-মেইল: jagosangbadmedia@gmail.com

প্রিন্ট করুন