লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভায় জন্ম নিবন্ধনে তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। হাতে দেওয়া জন্ম নিবন্ধন সনদে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে সরকারি অনলাইন সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্যের মিল না থাকায় পাসপোর্ট, ভিসা, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরির আবেদনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা থেকে ইস্যুকৃত জন্ম নিবন্ধন সনদে এক ধরনের জন্মতারিখ থাকলেও অনলাইনে তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন তথ্য। কোনো ক্ষেত্রে এক বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও ১০ বছর পর্যন্ত জন্মসনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। এ কারণে বিভিন্ন সেবা গ্রহণে জটিলতায় পড়ছেন ভুক্তভোগীরা।
রায়পুর পৌরসভার এক ভুক্তভোগী বলেন, “আমাকে যে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়েছে, সেখানে যে জন্মতারিখ রয়েছে, অনলাইনে যাচাই করতে গিয়ে দেখি সার্ভারে ১০ বছরের পার্থক্য। এই ভুল সংশোধন করতে গিয়ে আমার পাসপোর্ট ও ভিসার কাজ আটকে যায়। দুইবার মেডিকেল সম্পন্ন করার পরও নির্ধারিত সময়ে বিদেশে যেতে পারিনি। এতে আমি আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।”
জেলার একটি ইউনিয়নের আরেক ভুক্তভোগী জানান, তার হাতে থাকা জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং সরকারি সার্ভারের তথ্যের মধ্যে এক বছরের পার্থক্য রয়েছে। তিনি বলেন, “এই ভুল সংশোধনের জন্য বারবার ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কবে সমস্যার সমাধান হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।”
এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী অভিযোগ করেন, তার স্বামীর জন্ম নিবন্ধনে ‘আমির হোসেন’ নামের পরিবর্তে শুধু ‘আমির’ উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ওই ভুল সংশোধনের জন্য তাকে প্রায় ৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তার অভিযোগ, জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের নামে কিছু অসাধু ব্যক্তি অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে, যার কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি হয়রানিরও শিকার হচ্ছেন। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ ধরনের সমস্যা বিচ্ছিন্ন নয়; জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা, দাপ্তরিক জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ভুক্তভোগীদের বারবার দপ্তরে যেতে হচ্ছে। পাশাপাশি সংশোধনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, জন্ম নিবন্ধনের তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে শুধু বিদেশগমন নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরির আবেদন, ব্যাংকিং সেবা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমেও জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। একটি ছোট ভুল সংশোধন করতে গিয়ে অনেককে দিনের পর দিন সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, “যাদের জন্ম নিবন্ধনে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভায় গিয়ে আবেদন করবেন। আবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে বিষয়টি আমরা দেখব এবং নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউসার বলেন, “এ ধরনের ভুল সাধারণত তথ্য এন্ট্রি বা দাপ্তরিক ত্রুটির কারণে হয়ে থাকতে পারে। তবে কেউ এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আসবেন। আমরা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নিয়ম অনুযায়ী জন্ম নিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
সচেতন নাগরিকদের মতে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়গুলোর কার্যক্রমে নিয়মিত তদারকি, তথ্য এন্ট্রিতে অধিক সতর্কতা এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে জন্ম নিবন্ধনের তথ্যগত অসঙ্গতি দূর করবে, হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের সমস্যা আর না হয়, সে জন্য স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
জাগো সংবাদ/আরাফাত/জাকির

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: Saturday, 4 July, 2026 । 1:52 pm