রাজশাহীর পদ্মা যেন মৃত্যুর নীরব ফাঁদ, এক দশকে প্রাণ গেছে দুই শতাধিকের

মো. মাহফুজ আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশের সময়: Tuesday, 8 September, 2026 । 11:00 am

পদ্মায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন শফিকুল ইসলাম। তার কাছে নদী যেমন জীবিকার উৎস, তেমনি প্রতিদিনের ঝুঁকিরও কারণ।

তিনি বলেন, নদীর মাঝখানে মাছ ধরার সময় হঠাৎ ঝড়, ঢেউ বা প্রবল বাতাস শুরু হলে ছোট নৌকা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় জেলেদের জন্য সরকারি উদ্যোগে লাইফ জ্যাকেটসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।

অসচেতনতাকেই দায়ী করছে ফায়ার সার্ভিস

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজশাহীসহ চার জেলায় গত পাঁচ বছরে ৬১টি নৌ-দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৭০ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে রাজশাহীতেই প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি।

তার মতে, এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অসাবধানতা ও অসচেতনতা। অনেক নৌকায় লাইফ জ্যাকেট থাকলেও যাত্রীরা তা ব্যবহার করেন না। আবার ছোট নৌকায় ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। গোসল করতে নেমেও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন।

এক-দুই দিনের অভিযান যথেষ্ট নয়

রাজশাহী অঞ্চলের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, পদ্মার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। মাঝি ও নৌ-ভ্রমণকারীদের সচেতন করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে নৌকাডুবিতে বাবা-ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় অতিরিক্ত যাত্রী বহনের বিষয়টি সামনে এসেছে। পরে সংশ্লিষ্ট নৌকাসহ অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী নৌকার বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে। যেসব নৌকায় লাইফ জ্যাকেট নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধেও জরিমানার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে তিনি স্বীকার করেন, এক-দুই দিন অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রাখলেই নদীপথে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব।

তদন্ত কমিটি হয়, বদলায় না বাস্তবতা

পদ্মায় বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই স্থানীয় প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি, নেওয়া হয় বিভিন্ন সুপারিশ। কিন্তু দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই অনেক ক্ষেত্রে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি ও দৃশ্যমান উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। ফলে একই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে এবং নতুন করে তৈরি হচ্ছে স্বজন হারানোর বেদনা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, নৌ-দুর্ঘটনা রোধে মাঝি ও বিনোদনপ্রেমীদের সচেতন করতে পদ্মাপাড়জুড়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং নৌযানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নেপথ্যে অব্যবস্থাপনাই বড় প্রশ্ন

পদ্মার প্রবল স্রোত, ঘূর্ণাবর্ত কিংবা বৈরী আবহাওয়া মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী বহন, লাইফ জ্যাকেটের ঘাটতি, প্রশিক্ষিত মাঝির অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান এবং পর্যাপ্ত নজরদারির দুর্বলতা—এসব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

তাই রাজশাহীর পদ্মায় এক দশকে দুই শতাধিক প্রাণহানির পেছনে শুধু নদীর স্বাভাবিক ভয়াবহতাকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ, নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাঝিদের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

নইলে পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে আর কত পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াতে হবে-সেই প্রশ্নের উত্তরই থেকে যাবে অমীমাংসিত!

সম্পাদক: মোঃ মিজানুর রহমান নির্বাহী সম্পাদক: মোঃ আরাফাত আলী ফোন: ০১৮১৩-৫৩৮৩১৯, ০১৬২০-১৯০৮৮৫ ই-মেইল: jagosangbadmedia@gmail.com

প্রিন্ট করুন