দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যেই তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, অবৈধ নিয়োগ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগটি অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কমে প্রায় ২ হাজার ১১৪ থেকে ২ হাজার ১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এতে শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহকরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাসের চাপ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
তিতাসের আওতাধীন এলাকাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কোম্পানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ ১৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে রয়েছে। ফলে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের রান্নার কাজে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি পাইপলাইনের ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশের ঘটনাও কোথাও কোথাও সংকটকে আরও জটিল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তিতাসের এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ১৯৯৯ সালে কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে শাহনেওয়াজ পারভেজ পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত তিন বছরের বিটেক ডিগ্রির ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমমান সনদ জমা দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ এবং অনুমোদিত লোড বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
লিখিত অভিযোগে প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির ঘটনায় প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৫০০ অবৈধ সংযোগের বিপরীতে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অর্থ আদায়ের সঙ্গে শাহনেওয়াজ পারভেজের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিযোগে পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে সাগরের অফশোর বিডিং রাউন্ড নিয়েও অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ না করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে নিরুৎসাহিত করা এবং একটি ভারতীয় কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি এবং সহকর্মীদের হয়রানির মতো অভিযোগও রয়েছে শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে একাধিক অভিযোগের তদন্ত হয়েছে। তবে এসব তদন্তের ফলাফল কী হয়েছিল কিংবা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে শাহনেওয়াজ পারভেজের বক্তব্যও পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, একটি মহল তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অভিযোগ দিয়েছে এবং সেসব অভিযোগের তদন্তও হয়েছে। তবে তদন্তের পর মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
এদিকে, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুদকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর তিতাসের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকটের সময়ে গ্যাস সংযোগ, লোড বৃদ্ধি ও অবৈধ সংযোগের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠানের একাংশের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একই সঙ্গে গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম বন্ধ করে সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি উঠেছে।
জাগো সংবাদ/আরাফাত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: Friday, 11 September, 2026 । 3:18 pm