রাজউকের জোন-৪ পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৪-এর পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তার অধীনে রাজউকের কয়েকটি জোনাল অফিসে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সালেহ আহমেদ জাকারিয়া বর্তমানে রাজউকের মহাখালী জোনাল অফিসে জোন-৪-এর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে জোন-৩-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতেও দেখা গেছে বলে দাবি সূত্রের। মিরপুর, গুলশান, বনানী ও উত্তরার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো তার প্রশাসনিক আওতাধীন হওয়ায় ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় ফাইল পরিচালকের অনুমোদন ছাড়া অগ্রসর হয় না এবং ‘ম্যানেজমেন্ট ফি’ নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
ইমারত পরিদর্শকদের নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগ
জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে অন্যতম হলো রাজউকের ইমারত পরিদর্শকদের একটি অংশকে নিয়ে কথিত সিন্ডিকেট পরিচালনা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন ভবন নির্মাণের সময় পরিদর্শকরা বিভিন্ন ত্রুটি চিহ্নিত করে ভবন মালিকদের জোনাল অফিসে পরিচালকের সঙ্গে ‘যোগাযোগ’ করার পরামর্শ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, কথিত অর্থ দিতে রাজি না হলে ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা নকশাবহির্ভূত অংশ ভেঙে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরিদর্শকদের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ পরিচালকের কাছে পৌঁছানোর অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংবাদকর্মীর ওপর হামলার ঘটনায় প্রশ্ন
২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি রাজউকের এক ইমারত পরিদর্শক মো. সোলাইমান হোসেনের বিরুদ্ধে নিজ কক্ষে এক সংবাদকর্মীর ওপর হাতুড়ি দিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শী থাকার পরও বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। হামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং তাদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগে রাজউকের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা তৈরি হয়।
অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ
প্রশাসনিক পদায়ন নিয়েও সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসএসসি পাস আব্দুর রহিমকে জোন-৩-এর প্রধান ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি দায়িত্বে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা না করে কাউকে পদায়ন করা হলে ভবন নির্মাণ তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যোগ্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর অভিযোগও রয়েছে।
ভবন মালিকদের হয়রানির অভিযোগ
জাকারিয়ার বিরুদ্ধে বৈধ ভবন মালিকদের বিভিন্ন অজুহাতে নোটিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো ভবনে সামান্য বিচ্যুতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে উচ্ছেদ বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পরে দালাল বা অসাধু কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির অভিযোগও রয়েছে।
বেইলি রোড ও বনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে রাজউকের পরিদর্শন জোরদার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন
সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার কথিত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পূর্বাচলে তার প্রায় ২০ কাঠা জমি, মালিবাগে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং টাঙ্গাইলে নিজ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, পরিমাণ ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাংবাদিকদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সালেহ আহমেদ জাকারিয়া সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। ফোনকল গ্রহণ না করা, কল কেটে দেওয়া কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা।
এদিকে তার বিরুদ্ধে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করার জন্য বিশেষ অর্থের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারীরা বলছেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ ও ভবন নির্মাণ তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। তাদের দাবি, জোন-৩ ও জোন-৪-এ সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার দায়িত্ব পালনকালে অনুমোদিত ভবনের নকশা, নিষ্পত্তি হওয়া অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম উচ্চপর্যায়ের অডিটের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, অযোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত এবং রাজউকের অনুমোদন ও তদারকি কার্যক্রম আরও ডিজিটাল করার দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে প্রশাসনিক কাজে অপ্রয়োজনীয় মানবিক হস্তক্ষেপ কমানোর পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও সীমিত করা সম্ভব।
সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাগো সংবাদ/আরাফাত

