‘বিচার তো অনেক দূরের কথা, চার মাস পার হয়ে গেল; এখনো জানতে পারলাম না, আমার মা ও তিন বোনকে কেন হত্যা করা হলো।’ বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৮)। এক রাতেই মা ও তিন বোনকে হারিয়ে পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য হিসেবে এখন অনেকটাই নিঃসঙ্গ তাঁর জীবন।
গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তিন বোন সাইমা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ওরফে ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার ওরফে সিফা (১০)। ওই ঘটনার পর পুরো পরিবারে বেঁচে আছেন শুধু সিফাত।
স্বজনদের হারানোর পর পাশের একটি বাসায় থাকছেন তিনি। জীবিকার তাগিদে এলাকার একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ নিয়েছেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কর্মস্থলে কাটলেও রাতে বাসায় ফিরলে মা ও বোনদের স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। তাঁদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করে এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
সিফাতের আক্ষেপ, হত্যাকাণ্ডের চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে পারেননি তিনি। তাঁর প্রশ্ন, কী কারণে তাঁর মা ও তিন বোনকে এভাবে হত্যা করা হলো? অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার একাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, নাকি এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল? ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুন ওই বাসায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় স্থানীয় লোকজন অন্তর মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়।
ঘটনার পরদিন ধানহাটা এলাকায় জানাজা শেষে নিহত চারজনের মরদেহ কুমিল্লার হোমনায় তাঁদের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় সিফাত বাদী হয়ে রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। অন্যদিকে, গণপিটুনিতে অন্তর মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি হত্যা মামলা করে।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রেমঘটিত বিরোধ, অর্থ লেনদেন, স্বর্ণালংকার লুট কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তদন্তে এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে কিছু স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে শুধু লুটপাটের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না পুলিশ। তবে পরিবারের ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন বাসায় পাওয়া যায়নি। পরে অন্তরকে গণপিটুনি দেওয়ার স্থান থেকে ফোন দুটি উদ্ধার করা হয়। সেগুলো তিনি বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্তর মজুমদারের আগে নিয়মিত মুঠোফোনে যোগাযোগ ছিল কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। তবে নিয়মিত যোগাযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দুটি মামলার তদন্ত করছেন রায়পুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, মামলাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ, ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা হচ্ছে। প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।
চার মাস আগে এক রাতেই মা ও তিন বোনকে হারিয়েছেন সিফাত। স্বজনদের স্মৃতি নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন তিনি। দিনের বেলায় জীবিকার তাগিদে কাজ করলেও রাতের নীরবতায় ফিরে আসে হারানো স্বজনদের স্মৃতি। তাঁর অপেক্ষা—কেন এই হত্যাকাণ্ড, কারা জড়িত ছিলেন এবং এর পেছনের প্রকৃত রহস্য কী? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে, অপরাধের বিচার হবে—এ আশাতেই দিন কাটছে পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য সিফাতের।