শিক্ষকদের যোগদানে লাগছে টাকা
নানা ধাপ উতরে প্রায় তিন বছর পর চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন নতুন শিক্ষকরা। নিয়ম অনুযায়ী এসব শিক্ষকের সরাসরি স্কুল কলেজে যোগ দেয়ার কথা। কিন্তু ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষক এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ফলে যোগ্যতা ও সরকারের নির্দেশনার পরও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে পারছেন না শিক্ষকরা।
তারা বলছেন, বিদ্যালয়ের কাগজ-পত্র নেয়ার পরও ব্যবস্থাপনা কমিটি সাড়া দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে যোগদান করতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকাও দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ জার্নালের কাছে এ বিষয়ে অন্তত ৩০টি অভিযোগ এসেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনটিআরসিএ) বিষয়টি নজরে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপরও হয়রানি ভোগান্তি বন্ধ হচ্ছে না।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে যশোরের কেশবপুর উপজেলার একজন শিক্ষক বলেন, আমি স্কুলে যোগদানের জন্য গেলে আমাকে ব্যবস্থাপনা কমিটি বিভিন্নভাবে হেনস্থা করেছে। ৫০ হাজার টাকা দাবির প্রেক্ষিতে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দেয়া হলেও সে টাকা তারা ফিরিয়ে দিয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটি এতটাই শক্তিশালী যে আমার আর বিকল্প কিছুই করার নেই।
খুলনার ভুক্তভোগী মোস্তফা মামুন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, আমরা কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করতেও ভয় পাচ্ছি। কারণ জলে থেকে কখনো কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায় না। আমি যে বিদ্যালয়ের জন্য সুপারিশ পেয়েছি তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, টাকা ছাড়া যোগদান করতে পারবেন না। এখন আমি নিরুপায়। ভাবছি ধার করে হলেও এভাবেই শিক্ষকতা পেশায় ঢুকতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে বাছাই করে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হলেও কমছেনা দুর্নীতি। শুধু ব্যবস্থাপনা কমিটিই নয়, অভিযোগ রয়েছে যোগদানের পর উপজেলা শিক্ষা অফিস ও মাউশি অঞ্চলেও এমপিওর জন্য টাকা দিতে হবে হাজারো শিক্ষকের।
এসব বিষয়ে সাবেক শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, এনটিআরসিএ যখন সুপারিশ করেছে তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা কমিটির বাবারও সাধ্য নেই যোগদান না করতে দেয়া। যেহেতু তিনি সুপারিশ পেয়েছেন তাই এই শিক্ষককে নিয়োগ দিতেই হবে।
নতুন শিক্ষকদের উদ্যেশ্যে তিনি বলেন, সাহস হারালে চলবে না। ঘুষ দেয়া যেমন খারাপ ভয় পাওয়া আরো খারাপ। এজন্য দুর্নীতি দমন কমশিন, শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। প্রয়োজনে এসব জায়গায় অভিযোগ দেয়ার কথা বলেন তিনি।
জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থীদের সনদ দিতে ২০০৫ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে এনটিআরসিএ। এই সনদ নিয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য স্কুল কলেজে আবেদন করতেন প্রার্থীরা। এরপর ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে নিয়োগ পেতেন শিক্ষকরা। কিন্তু এতে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অদক্ষ লোকরা শিক্ষকতা পেশায় ঢুকতেন। এই জটিলতা নিরসনে ২০১৫ সাল থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতায় পরিবর্তন করে এনটিআরসিএকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব দেয়ার পর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া গতি হারিয়েছে। অন্যদিকে নিয়োগ পেতে শিক্ষকদের ঘুষও দিতে লাগছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাশী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি ও নিয়োগ প্রত্যাশী শান্ত আহমেদ বলেন, এমন শতশত অভিযোগ আসছে। বিষয়টি আমরা এনটিআরসিএ চেয়ারম্যানকে মৌখিকভাবে জানিয়েছি। তিনি আমাদেরকে লিখিতভাবে জানানোর কথা জানিয়েছেন। সত্যি কথা বলতে কি অনেকেই যোগদানের নির্দেশনা মানছেন না। যেকারণে আমাদেরকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। মাউশি থেকে এ বিষয়ে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলো অনেক ভালো হতো।
জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষক নিয়োগ ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ (এসটিআরসিএ) সচিব ওবায়দুর রহমান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ম্যানেজিং কমিটির এই টাকা দাবিটা দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। তাই তারা ছাড়তে পারছে না। কিন্তু সুপারিশপত্রে লেখা আছে যদি কোনো কারণ ছাড়া কোনো শিক্ষককে যোগদান করতে না দেয়া হয় তবে প্রধান শিক্ষক ও কমিটির বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়া যাবে। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখের পরে যদি যোগদান না করতে দেয় তবে আমাদেরকে লিখিতভাবে জানালে আমরা ব্যবস্থা নেবো।
কেমন অ্যাকশন নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে অনেক প্রধান শিক্ষকের তিন মাসের বেতন কর্তন করা হয়েছিলো। এবার এই শাস্তি আরো বাড়ানো হবে। এমনকি ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করা হবে।

