নিয়োগে রোল নম্বর সংযোজন, টেন্ডার বাণিজ্য ও এনওসিতে তথ্য গোপনের অভিযোগ
বিডিসিসিএলে মুরাদ আলমের ‘একচ্ছত্র’ নিয়ন্ত্রণ
ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, নথিপত্রে কারসাজি এবং টেন্ডার বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিসিসিএল) প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মুরাদ আলম মনিরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও প্রকিউরমেন্ট—দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে তিনি প্রতিষ্ঠানে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন।
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেননেক্সট টেকনোলজিস লিমিটেডকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ব্যাকডেটে রোল নম্বর সংযোজন, দরপত্রের শর্ত নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে তৈরি এবং পাসপোর্টের অনাপত্তি সনদে (এনওসি) নিজেকে ‘স্থায়ী কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
রাষ্ট্রের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো (কেপিআই) হিসেবে বিবেচিত একটি প্রতিষ্ঠানে এমন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে দেওয়া জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের এক অভিযোগপত্রেও এসব বিষয় তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
বিডিসিসিএলের একটি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর ‘উপসহকারী প্রকৌশলী (ট্রান্সমিশন)’ পদে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৩০ অক্টোবর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আতাউর রহমান খানের স্বাক্ষরে প্রকাশিত ফলাফলে সাতজন প্রার্থীকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অফিস আদেশ প্রকাশের প্রায় ১৫ দিন পর বিডিসিসিএলের ওয়েবসাইট থেকে মূল ফাইলটি সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে একই তারিখ বহাল রেখে পরিবর্তিত একটি ফাইল আপলোড করা হয়। নতুন ফাইলে আগের সাতজনের পাশাপাশি ‘SAET-039’ রোল নম্বরের আরও একজন প্রার্থীকে যুক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মুরাদ আলম মনিরের স্বাক্ষরে মৌখিক পরীক্ষার চূড়ান্ত নোটিশ প্রকাশ করা হয়। সেখানে ওই নতুন রোল নম্বরসহ মোট আটজনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা ও নথির ব্যাকডেটিং পর্যালোচনায় ফাইল পরিবর্তনের বিষয়টি শনাক্ত হয়েছে। তবে মুরাদ আলম মনিরের দাবি, রোল নম্বরটি তৎকালীন নিয়োগ কমিটির ভুলে বাদ পড়েছিল এবং পরে কমিটির অনুমোদনেই তা যুক্ত করা হয়।
বিডিসিসিএলের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও ক্রয় বিভাগের দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, মুরাদ আলম মনির দুটি বিভাগের দায়িত্বে থেকে বিভিন্ন দরপত্রের যোগ্যতা ও কারিগরি শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করেন, যাতে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ পড়ে এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পায়।
জেনেক্স টেকনোলজি, স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিংস লিমিটেড ও টেকভ্যালি নেটওয়ার্ক লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। ডাটা সেন্টারের ক্লাউড সম্প্রসারণ-সংক্রান্ত ইওআই প্রক্রিয়াতেও অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই না হলেও, একই কর্মকর্তার হাতে প্রশাসন ও প্রকিউরমেন্টের দায়িত্ব থাকা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিমের স্বামী তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী জেননেক্সট টেকনোলজিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি মেঘনা ক্লাউড পার্টনার হিসেবে বিডিসিসিএলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে একজন ভারতীয় নাগরিক থাকার বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কেপিআইভুক্ত একটি সংবেদনশীল তথ্য অবকাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততা ও প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মুরাদ আলম মনিরের বিরুদ্ধে পাসপোর্টের এনওসিতে তথ্যগত অসঙ্গতির অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের ৩ জুন টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের পরিচালকের কাছে পাঠানো এনওসিতে তাকে ‘স্থায়ী কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি নিয়োগপত্র অনুযায়ী ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তার চাকরি স্থায়ীকরণ-সংক্রান্ত বোর্ড সিদ্ধান্ত আসে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
অভিযোগকারীদের দাবি, স্থায়ীকরণের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের আগে নিজেকে স্থায়ী কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে এনওসি নেওয়ার বিষয়টি সরকারি নথি যাচাই করে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অবশ্য মুরাদ আলম মনিরের বক্তব্য, তিনি যে পদে চাকরি করেন সেটি স্থায়ী পদ হওয়ায় ওই অর্থে এনওসিতে তাকে স্থায়ী কর্মকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিচয় বদলে বিভিন্ন মহলে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন মুরাদ আলম মনির। অতীতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার এবং সরকার পরিবর্তনের পর ছাত্রশিবির বা বিএনপির সমর্থক পরিচয়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ।
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. মুরাদ আলম মনির। তিনি বলেন, ‘আমি সৎভাবে আমার দায়িত্ব পালন করছি। এগুলো আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।’
জেননেক্সট টেকনোলজিসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। কিছুদিন আগে আমাকে এই কমিটির সদস্য করা হয়েছে।’ প্রতিষ্ঠানটির বোর্ডে থাকা ভারতীয় নাগরিকের তথ্যও তার কাছে নেই বলে জানান তিনি।
নিয়োগ পরীক্ষার ফল পরিবর্তন ও ‘SAET-039’ রোল নম্বর সংযোজনের অভিযোগের বিষয়ে মুরাদ আলম মনির বলেন, ‘আমি এখানে কিছুই করিনি। তৎকালীন নিয়োগ কমিটি প্রথম চিঠিতে SAET-039 রোলটি ভুলক্রমে তালিকায় লিপিবদ্ধ করেনি। পরে নিয়োগ কমিটির অনুমোদনক্রমেই ওই রোল নম্বর বসানো হয়।’
এনওসিতে নিজেকে স্থায়ী কর্মকর্তা উল্লেখের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি যে পদে চাকরি করি, সেই পদটি স্থায়ী। সেই অর্থেই এখানে স্থায়ী দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিডিসিসিএলের মতো কেপিআইভুক্ত রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, ক্রয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরামের পক্ষ থেকে মুরাদ আলম মনিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত এবং তদন্ত চলাকালে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণের একমাত্র পথ হলো সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নথি, ডিজিটাল ফাইলের মেটাডাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া, এনওসি এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের নথি স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বিডিসিসিএলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
জাগো সংবাদ/আরাফাত

